সুরের বাঁধনে মিলিত প্রাণ

সংগীতের সব শাখার শিল্পী ও কলাকুশলীদের সাধারণত একসঙ্গে দেখা যায় না। কিন্তু গতকাল সোমবার তাঁরা একত্র হয়েছিলেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। কে নেই সেখানে? রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, লোকগান, ধ্রুপদি সংগীত, আধুনিক গান কিংবা ব্যান্ডের শিল্পী—সবাই মিলেছিলেন অভিন্ন হূদয়াবেগে। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন গীতিকার, সুরকার আর যন্ত্রীরাও। উপলক্ষ, বিশ্ব সংগীত দিবস।
বাংলাদেশ সংগীত সমন্বয় পরিষদ ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর যৌথ উদ্যোগে দিবসের দিনব্যাপী কর্মসূচির সূচনা হয়েছিল শহীদ মিনারে। ‘সংগীত স্বজন এসো মিলি সুরের বাঁধনে’, এই স্লোগানে বিকেলে বেলুন উড়িয়ে আয়োজনের উদ্বোধন করেন প্রবীণ শিল্পী সোহ্রাব হোসেন। শুরুতে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মিনারে ফুল দেওয়া হয়। এরপর সুজিত মোস্তফা শোকপ্রস্তাব এবং সংগীত দিবসের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ রায়। ঘোষণাপত্রে সব শাখার শিল্পীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানানো হয়। এরপর মিনারের বেদির দুই পাশ দিয়ে ঢোল, করতাল, বাঁশি আর একতারা বাজিয়ে উঠে আসেন বাউলশিল্পীরা। নেচে-গেয়ে সংগীতের বিভিন্ন শাখার শিল্পীরা আনন্দে মেতে ওঠেন। সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন উদ্বোধনী সংগীত, ‘ধনধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’।
শহীদ মিনারে সমন্বয় পরিষদের সভাপতি তপন মাহমুদের সভাপতিত্বে ছিল আলোচনা। পরে মৃদঙ্গ সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘আজি বাংলাদেশের হূদয় হতে’ গানটি পরিবেশন করে। এরপর শহীদ মিনার থেকে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়ে শিল্পকলা একাডেমীতে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে জাতীয় নাট্যশালায় সন্ধ্যায় ছিল দ্বিতীয় পর্বের আয়োজন।
প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, আসাদুজ্জামান নূর, রামেন্দু মজুমদার, কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, কামাল লোহানী এবং আয়োজনের পৃষ্ঠপোষক ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। এরপর সাংস্কৃতিক পর্বের শুরুতে ছিল ভায়োলিন অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সমবেত বেহালা বাদন। এরপর প্রতীতি ‘এসো এসো ওগো শ্যামছায়া’, দোলনচাঁপা ‘মনের রং লেগেছে’, সারগাম ললিতকলা একাডেমি কবিতা থেকে গান ‘স্বাধীনতা তুমি’, গীতিসত্র ‘ফিরে চল আপন ঘরে’, নজরুলসংগীত শিল্পী পরিষদ ‘শুভ্র সমুজ্জ্বল হে চির নির্ম্মল’, বৈতালিক ‘শাওন গগনে’, গীতাঞ্জলি ‘প্রাণ ভরিয়ে তৃষ্ণ হরিয়ে’, জাগরণ সংস্কৃতি চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র ‘সোনায় মোড়ানো বাংলা আমার’, নিবেদন ‘আজ মনে হয় এই নিরালায়’ গান পরিবেশন করে। প্রায় ৩০টি সংগঠনের শিল্পীরা সাংস্কৃতিক পর্বে বিভিন্ন রকমের গান পরিবেশন করেন। সুরের বাঁধনে মিলিত হলো উপস্থিত যত প্রাণ। এক অনুষ্ঠানে রকমারি সংগীত পরিবেশিত হওয়ায় শ্রোতা-দর্শকেরা স্বাদ পেলেন বৈচিত্র্যময় বাংলা গানের। সেই সঙ্গে বিশ্ব সংগীত দিবসের এই আয়োজন পেল সর্বজনীন মর্যাদা।

ছৌনৃত্যের নান্দনিক উপস্থাপনা
শিশু একাডেমী মিলনায়তনের প্রবেশমুখেই ফুল আর মঙ্গলদীপের সজ্জায় গতকাল সন্ধ্যায় সৃষ্টি হয়েছিল চমৎকার দৃশ্যের। মিলনায়তন ভরা নৃত্যামোদী দর্শকদের স্বাগত জানালেন নৃত্যাঞ্চলের এই দুই পরিচালক শিবলী মহম্মদ ও শামীম আরা নীপা। আমন্ত্রণ জানালেন ছৌনৃত্য উপভোগ করতে।
নৃত্যাঞ্চল ও শিল্পকলা একাডেমীর যৌথভাবে আয়োজিত ১৫ দিনব্যাপী ছৌনৃত্য কর্মশালার সমাপনী হিসেবে ছিল এই নৃত্যসন্ধ্যা। দর্শকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় কর্মশালার পরিচালক ভারতের স্বপন মজুমদার ও সুচিতা মজুমদারকে। অনুষ্ঠানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন প্রধান অতিথি করুণাময় গোস্বামী।
এরপরই শুরু হয় ছৌনৃত্যের নান্দনিক উপস্থাপনা। প্রথমেই কর্মশালায় অংশ নেওয়া প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থী মিলনায়তনের মঞ্চে বিচরণ করে সাবলীল গতিছন্দে। তারা ঢোলের বোলের সঙ্গে ছৌনৃত্যের বিভিন্ন মুদ্রা ফুটিয়ে তোলে। ধীর থেকে দ্রুতলয়ের বাজনার সঙ্গে মঞ্চে তাদের পদক্ষেপ, হাতের সঞ্চালন ও শারীরিক ভারসাম্য প্রতিস্থাপনার বিষয়গুলো দর্শকদের মুগ্ধ করে। শিক্ষার্থীদের পরিবেশনার পর মঞ্চে আসেন কর্মশালার পরিচালক স্বপন মজুমদার। তিনি দর্শকদের ছৌনৃত্যের ঐতিহ্যগত মুদ্রাগুলো এবং এর সঙ্গে তাঁর নিজের সৃজনশীল সংযোজনায় বিষয়টি উপস্থাপন করেন। এরপর নৃত্যাঞ্চলের শিল্পীরা আরও ছয়টি পরিবেশনা উপস্থাপন করেন। সৃজনশীল নৃত্য বিভাগে ‘ধিতাং ধিতাং বোলে’, ‘নিগৃহীত নারী’, ‘শিল্পী’ ও আধুনিক আঙ্গিকে লোকনৃত্য ‘সামাল সামাল’ উপস্থাপন করা হয়। শেষে ছিল স্বপন মজুমদার ও সুচিতা মজুমদারের নৃত্যালেখ্য ‘সৃষ্টি’। নৃত্যাঞ্চলের আয়োজনে ছৌনৃত্যের এই পরিবেশনা দর্শকদের মোহিত করে।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জুন ২২, ২০১০

Tags: , , ,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>